রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আমদানি কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ওষুধ শিল্পের বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে। আমদানি করা এসব পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির মলিকুলসহ ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। এ ঘটনায় ওষুধ শিল্পে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
শাহজালাল বিমানবন্দরের আমদানি পণ্যের কার্গো ভিলেজে গত শনিবার আগুনের ঘটনায় কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিরূপণ করা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কার্গো ভিলেজে পুড়ে যাওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস-সামগ্রী, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশসহ আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের বহু শিপমেন্ট। তবে আগুনে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তারা জানান, দেশে ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও এর কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। দেশে যে ওষুধগুলো তৈরি হয়, তার বেশির ভাগ কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাই ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনায় ওষুধ সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ পুড়ে যাওয়া কাঁচামাল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্যান্সারসহ জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হতো। এলসি করে নতুন কাঁচামাল আনতে মাস খানেক সময় লাগে। কিছু কিছু কাঁচামাল কোল্ড স্টোরেজ নিশ্চিত করে আনতে হয়। তাই এগুলোর বড় মজুদ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকে না। সংশ্লিষ্টরা এসব ওষুধ সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সদস্য কোম্পানিগুলোর কাছে জানতে চেয়েছি, আগুনের ঘটনায় কার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। আগামীকালের (আজ) মধ্যে আমরা সঠিক পরিমাণ জানতে পারব। তবে বড় অংকের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এটা নিশ্চিত। সাপ্লাই চেইনে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব হয়তো পড়বে না। তবে ৮-১০ দিন পর প্রভাবটা বোঝা যাবে।’
ডা. মো. জাকির হোসেন আরো বলেন, ‘ভ্যাকসিন, ইনসুলিন বা বায়োলজিক—কোল্ড চেইন মেইনটেইন করে আনতে হয়। তাই এগুলোর বড় স্টক আমাদের হাতে থাকে না। ফলে যারা ইনসুলিন ভ্যাকসিন বা অ্যান্টি-ক্যান্সার-জাতীয় ওষুধ তৈরি করেন তাদের বড় চালান পুড়ে গেলে ইট উইল অ্যাফেক্ট আওয়ার সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলবে)।’
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুনে দেশের ওষুধ শিল্পের বার্ষিক আমদানীকৃত পণ্যের ৪ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ল্যাবএইড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম। গতকাল তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো প্রতি মাসে সীমিত আকারে ঋণপত্র (লেটার অব ক্রেডিট) করে পণ্য আমদানি করে। আমরা বছরে ওষুধের যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করি, তার ৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। যদি সরকার ও ব্যাংকগুলো এ খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্যান্সারের যে পরিমাণ ওষুধ মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে রোগীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। ক্যান্সার চিকিৎসায় বর্তমানে যে ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে, তার বিকল্প কী ওষুধ ব্যবহার করা যায়, সে পরিকল্পনাও নিয়ে রেখেছি। কোনো কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে হয়তোবা রোগীদের দুই-একদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।’
বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডে ক্যান্সারের ওষুধ ও যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে। এসব ওষুধ ও যন্ত্রাংশ নতুন করে দেশে আনতে দুই-তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দুই ধরনের ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির মলিকুল পুড়ে গেছে। এছাড়া ওষুধ তৈরির একটি যন্ত্রও সেখানে ছিল। সেটিও পুড়ে গেছে। আর্থিকভাবেও ক্ষতি হয়েছে। এগুলো নতুন এলসি করে আনতে তিন মাসের মতো সময় লেগে যেতে পারে। এতে সাপ্লাই চেইনেও প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি অর্থবছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১০১ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১০২ কোটি ৮০ লাখ ডলার।